আমার কাছে যেটা মনে হয় তা হলো বন্ধুত্বের শুরু একেবারে ছোটবেলা থেকে। আর শৈশব থেকে যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে তা সারাজীবন টিকে থাকে। আমি মনে করি এই যে, সারাজীবন বন্ধুত্ব ধরে রাখা এটা বেঁচে থাকার একটা বড় শক্তি। তাই এটা ধরে রাখা বা শৈশবের বন্ধুকে মনে রাখা খুবই জরুরি। তাছাড়া শৈশব বা কৈশোর থেকে গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব হারিয়ে যেতে না দিয়ে যদি ধরে রাখা যায় তাহলে সেটি দুজনের বন্ধুত্বের সীমা ছাড়িয়ে পারিবারিকভাবে রূপ নেয়। আর পারিবারিকভাবে রূপ নিলে দুই পরিবারের বিপদে যেমন এগিয়ে আসতে পারে তেমনি আনন্দেও শরিক হতে পারে।
বন্ধুত্বে ছেলে বা মেয়ের মধ্যে ভেদাভেদ করা উচিত নয়। একটা ছেলে বা মেয়ের মধ্যে খুব স্বাভাবিকভাবেই বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে পারে। এতে করে দুজনের মধ্যে জানা এবং বোঝাপড়ার একটা সম্পর্ক তৈরি হয়। তবে বন্ধুত্বের সম্পর্কের রশিটা সবসময় জৈব সীমার ঊর্ধ্বে রাখা উচিত। এখানে যেন কোনও হিংসা, বিদ্বেষ, প্রতিহিংসা গিট্টু না লেগে যায়। তাহলেই বন্ধুত্বের সূত্রটাকে বিয়েপরবর্তী সময়ে সচল রাখা যায়। যেমন স্ত্রীর বন্ধুদের স্বামী যেন সন্দেহের চোখে না দেখে আবার স্বামীর বন্ধুদের স্ত্রী যেন সন্দেহের চোখে না দেখে তাহলেই বন্ধুত্বটা টিকিয়ে রাখা সম্ভব। তাই স্বামী বা স্ত্রীর মধ্যে একে অপরের বন্ধু সম্পর্কে পরিষ্কার থাকা দরকার। আর বন্ধুত্বের আচরণটা এমন থাকা উচিত যাতে সন্দেহের সুযোগ তৈরি না হয়। তাছাড়া স্বামী বা স্ত্রীর মধ্যেও একটা ভালো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা উচিত বলে আমি মনে করি।
আমার ব্যক্তিগত জীবনের একটা গল্প বলি। রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী নাহার জামিল আমার স্কুলজীবনের বন্ধু। বগুড়ায় ভিএম স্কুলে আমরা একসঙ্গে ক্লাস সিক্স এবং সেভেনে পড়াশোনা করেছি। তারপর আমরা বগুড়া ছেড়ে চলে যাই। আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও আমাদের বন্ধুত্বে একটুও টান পড়েনি। একটা সময় এসে আমাদের যোগাযোগ হয়। আমার মেয়ে ফারিয়া লারার নামে রাজেন্দ্রপুরে একটা ফাউন্ডেশন করেছি। সেখানে গরিব রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তো সেই ফাউন্ডেশনে নাহার জামিল একটা বড় অঙ্কের টাকা দান করল। তাদের জাকাতের টাকা থেকে এই দান করেছে। তো আমার কাছে যে ব্যাপারটা মনে হয়েছে সেটি হলো, বন্ধুত্ব না থাকলে সে নিশ্চয় এই ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করত না। সে তো টাকাটা অন্য কোথাও ব্যয় করতে পারত। কিংবা প্রতি বছর যেভাবে শাড়ি ও লুঙ্গি কিনে জাকাত দেয় সেভাবেই দিতে পারত। কিন্তু বন্ধুত্বের টান বলে কথা।
আমার কাছে মনে হয়, বন্ধুত্ব হলে যে প্রতিদিন যোগাযোগ করতে হবে এমন কোনও কথা নেই। যোগাযোগবিহীন থেকেও বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখা যায় দিনের পর দিন। আসলে বন্ধুত্ব হলো একজনের জন্য আরেকজনের চিনত্মার সুযোগ সৃষ্টি করা। পরস্পরকে বুঝতে পারা। তার চিন্তা, তার দর্শন, তার সবকিছুই বোঝা এবং শেয়ার করার নামই বন্ধুত্ব। একটা গান শুনছি, একটা ভালো বই পড়ছি- এই বিষয়গুলো যদি প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে শেয়ার করা যায় তাহলে বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব।
বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় স্কুল লাইফ। কারণ খুব ছোটবেলায় বাবা-মার আধিপত্য কাজ করে সন্তানের ওপর। তাই সঠিক বন্ধু নাও পাওয়া যেতে পারে। তাই যে বন্ধুত্ব করবে চয়েসটা তাকে করতে দিতে হবে। বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে। আর এক্ষেত্রে যদি খারাপ বন্ধুদের সঙ্গে মেশে তাহলে ফিরে আসার দায়িত্ব তার নিজের। তবে সন্তানকে বাবা-মায়ের বোঝাতে হবে খারাপ এবং ভালো ব্যাপারটি কী? তাহলে সন্তান যখন বুঝতে পারবে তখন খারাপ বন্ধুদের সঙ্গ সহজেই ত্যাগ করবে। তা না হলে হয়তো ঠিক উল্টো ব্যাপারটি ঘটতে পারে। কারণ খারাপ বন্ধুদের সঙ্গে মিশে অনেককে খারাপ পথে যেতে দেখা গেছে। এমনকি মৃত্যুবরণ করতে দেখা গেছে।
তাই কখনও কখনও পরিবারের গাইডও দরকার হয়। তবে সেই গাইড যেন মাত্রাতিরিক্ত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আর ছেলেমেয়েদেরও খেয়াল রাখতে হবে স্বাধীনতা যেন বাজে কাজে ব্যবহার না করে। একটা ভুল সিদ্ধান্ত অনেক সময় বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনে। তাই বন্ধু এবং বন্ধুত্বকে সম্মান জানিয়ে জীবনে চলতে হবে। মনে রাখতে হবে বন্ধুত্ব একদিনের জন্য নয়, এটা সারাজীবনের জন্য।
বর্তমানে ঘটা করে বন্ধুদিবস পালন আমার কাছে বেশ ভালো মনে হয়।
অন্তত একটা দিনের উপলক্ষে সবাই দলবেঁধে ঘুরে বেড়াক, গিফট দিক, এটা খারাপ কি? এটা অবশ্যই ভালো একটা ব্যাপার। একটা বন্ধুকে মনে করে তার জন্য কোনও উপহার কেনা- এটা বন্ধুত্বের একটা বড় নিদর্শন।
|